[+] Tools

Color Theme

Font Size

Results

Cookie color (CSS):

Cookie width (CSS):

Cookie fontsize(CSS):


Use the reload link, to see, if the cookie works!

Reload page !
Universatil template, by 55thinking
Sreemadbhagbad Gita Sangha

দেবী কম্পিউটারবাহনা

Attention: open in a new window. PDFPrintE-mail

Last Updated (Tuesday, 30 November 1999 00:00) Written by Radha Krishna Saturday, 31 January 2009 05:17

পুরুতের তাড়া, বছরের প্রথম কুল, কিম্পউটারের পায়ে হলুদ গাদার
ফুল— ‘বিদ্যাস্থানে ভয়েবচ’ সরস্বতীপুজোর নানা কিস্‌সা
ও ছেলেবেলার হিস্‌সা নিয়ে লিখলেন

সুধীর চক্রবর্তী

ছোটবেলায় দেখতাম সরস্বতী পুজোর সঙ্গে কৈশোরের কী একটা যোগ যেন আছে। আর সব পুজো বড়দের, কেবল বাড়িতে সরস্বতী পুজোর সকালে ছোটদের বইপুজো, অঞ্জলি দেওয়া, প্রসাদে বীরখণ্ডি (কেউ বা বলে তিলে পাটালি) আর বছরের প্রথম কুল খাওয়া। গুরুজনদের সতর্কবাণী থাকত: সরস্বতী পুজোর আগে কুল খেলে বিদ্যে হবে না। ঔপনিবেশিক এই দেশে মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত পরিবার-কাঠামোয় ‘বিদ্যে’ সম্পর্কে বড্ডই স্পর্শকাতরতা ছিল। সকল পড়ুয়া-কিশোরদের কাছে, গাধার সামনে মুলোর মতো ওই একটা আপ্তবাক্য অদৃশ্য অক্ষরে লেখা থাকত:
লেখাপড়া করে যে
গাড়িঘোড়া চড়ে সে।

কথাটা এখন ক্ষয়ে গেছে— সে কালে ওইটাই কিন্তু ছিল উজ্জীবনের মূলমন্ত্র। সরস্বতীর বরপুত্র বলে একটা কথা শোনা যেত। কিন্তু অভিজ্ঞতা ঘেটে দেখছি, মা সরস্বতী সম্পর্কে গভীর আস্থা ছিল ততটা গুডবয়দের নয়, যতটা ‘বিদ্যাস্থানে ভয়ে বচ’-দের। তারাই নিষ্ঠার

সঙ্গে এই ‘বিদ্যাং দেহি’ দেবীকে ডাকত ভক্তি ভরে, খুব চেষ্টা করত কুল না খেতে, কিন্তু খেয়ে ফেলতই বনে-বাদাড়ে বা বেপাড়ায় গাছ ঝঁাকিয়ে, অবশ্য স্বীকার করত না। সারা বছর যাদের হ্যারিকেনের আলোয় পড়তে বসে চোখ জুড়ে যেত শ্রািন্ততে, সারা বিকেল ধরে বল পেটানোর চোটে— তারাই এই অনধ্যায়ের একটি মাত্র দিনে ছিল মা সরস্বতীর একনিষ্ঠ ভক্ত। ওই দিন পড়া নিষেধ। পড়তে বসতে বললে যাদের জ্বর আসত, বইয়ের পাতার অক্ষরের জঙ্গলে যারা পথ হারাত, তারাই সরস্বতীর মূর্তির পায়ের কাছে ভক্তি ভরে রেখে দিত ক্লাসের পাঠ্যবই ডঁাই করে— যদি দেবী দয়া করে ওই দুর্বোধ্য বিষয়গুলি কোনও ভাবে বিদ্যার্থীর স্থবির মগজে অন্তঃপ্রবিষ্ট করিয়ে দেন, সেই ভরসায়। পুজোর পর মূর্তির পদতল থেকে গাদাফুলের ছেঁড়া টুকরো বইয়ের পৃষ্ঠার মধ্যে গুজে রেখে সে কী আত্মপ্রসাদ! ভাবটা, এ বার কে আর ঠেকায় আমাকে! বাবার হাতের চড়, দাদাদের কানমলা, ক্লাস-টিচারের বেত বা নিল-ডাউন করানো, এত সব অনুপান দিয়েও যাদের বিদ্যে ব্যাপারটা গেলানো যেত না কিছুতেই, তাদের কিন্তু দেবীর ওপর আস্থা টলতে দেখিনি কোনও দিন। তারাই রাত জেগে লাল নীল হলদে রঙের কাগজ কেটে শিকলি বানাত, দিদিদের বা পিসিদের দিয়ে আলপনা দেওয়াত মেঝেয়, জোগাড় করে আনত গাছে চড়ে পলাশফুল, কঁাধে করে কুমোরপাড়া থেকে ঠাকুর আনাতে বা বিসর্জন দিতে তাদের উৎসাহের কিছু কমতি দেখিনি। অবশ্য, পুজোর চেয়ে প্রসাদ ভক্ষণের টানটা ছিল বেশি। পেতলের ডেকে রাধা মুগের ডালের খিচুড়ি, বাধাকপির তরকারি আর কুলের অম্বল— আঃ, এখনও যেন জিভে জল আসে। কিন্তু, খাওয়া তো সব শেষে এবং তারও পরে বিসর্জনের নাচ। কিন্তু তার আগে?

সব চেয়ে আগে অবশ্য পাড়ার ক্লাবের জানানদারি, রাস্তায় ব্যানার টাঙিয়ে: ‘বাণীবন্দনায় অর্ঘ্য ক্লাব’ কিংবা ‘ভারতীর আরতিতে আমরা কজন’। দেখেশুনে দলে না-নেওয়া পঞ্চু বিক্ষুব্ধদের ক’জনকে জড়ো করে চ্যাটাইয়ের ওপর কাগজ সেটে তাদের টালির ছাদ বরাবর বাখারি দিয়ে ঘোষণা করল: ‘বিদ্যাদেবীর আরাধনায় ইন ক্লাব’। তাতেই কি কাজ শেষ হওয়ার? একটা পাতলা এক্সারসাইজ খাতায় ক্লাবের নাম লিখে দোকানে দোকানে হানা: দাদা, sরোsতি পুজোর চঁাদাটা দিন। সিকি আধুলি গোটা কয়েক দুরছাই করেও জুটে যেত না কি আর!

কিন্তু গোল বাধল আমাদের পাড়ার মোড়ে অিশ্বনীজ্যাঠার বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে গিয়ে। পঞ্চু (যার নামই হয়ে গিয়েছিল ফেল-করা পঞ্চু) আর তার দলবলের চঁাদা-অভিযান দেখেই জ্যাঠা হঁাক পাড়লেন: অ্যাই, ইদিকে আয়। সরস্বতী পুজো করছিস, বল্‌, সরস্বতী বানান বল্‌ তো দেখি।

 

 

পঞ্চু বুক চিতিয়ে বলল, এ আর কী এমন শক্ত দাদু— দন্ত্য স-য়ে ব-য়ে, তার পরে ড-এ বিন্দু র, দন্ত্য স, ত-য়ে হস্যি। কী, দাদু, চঁাদা দেবেন তো?
হয়েছে, হয়েছে। বিদ্যের জাহাজ সব। যা ভাগ। বানান ঠিক করে তার পরে আসবি, বুঝলি?

কিন্তু ফেল-করা পঞ্চুদের দমায় কে? স্বয়ং মা ‘স্বড়সতি’ তঁার বানান বিপর্যয় নিয়ে সঙ্গে থাকলে ভয় আর কাকে? তবে, হঁ্যা, পুজোর আগেই কুল খাওয়া হয়ে গেছে সেটা স্বীকার করে নিতে হবে। তা হলেই সব দোষ মাফ। তবে, সামনে কঠিন দিন আসছে— ‘অ্যানোয়ালি’ পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোবে যে দিন। ওই দিনটাই যা ভয়ঙ্কর। থমথমে মুখে ঢিপঢিপ বুকে বসে থাকা ক্লাসরুমে। ক্লাস টিচারের সঙ্গে হেডু স্যার এসে গম্ভীর মুখে রেজাল্ট জানাবেন— কে পাস কে ফেল! তিনি ঘরে ঢোকার আগেই পঞ্চুর মাথায় গাট্টা মেরে তুলসি ছড়া আওড়েছে: ‘টু ডে/ হাসিকান্নার েপ্ল’। বলতে নেই ফেল-করা পঞ্চুর কান্নাই বরাদ্দ। কিন্তু, অঞ্জলি দেওয়ার উৎসাহ তার প্রবল।

ভাবতে ভাবতে মনে এল, এ সব দিন কি একেবারেই পালটে গেছে? সরস্বতী পুজোর দিনটা নিয়ে বড্ড যে আনন্দ আর আততি ছিল আমাদের। সেই ভোরে ভোরে ওঠা, ছাদের রোদে দঁাড়িয়ে খালি গায়ে তেল-হলুদবাটা মাখিয়ে মা-র চান করিয়ে দেওয়া হি-হি করা শীতে— তার রোমাঞ্চ কি আজকে আর নেই? কিংবা দিদি বা ছোট বোন যে আবদার করে শাড়িতে হলুদ রং ছুপিয়ে নিত, তার পরে সেই হলুদ শাড়ি আধগোছানো করে পরে সে কী ছুট ইস্কুলের দিকে! ‘কৈশোর-যৌবন যবে দোহে দেখা দিল’, সেই সময়ে পথে বেরিয়ে বন্ধুদের নিয়ে মেয়ে-ইস্কুলে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার সেই অদম্য টানটা আজও কি ছেলেদের আছে? মাঘের উতলা হাওয়ায় কলেজের সহপাঠিনীদের শ্যাম্পু-করা চুলের ছড়ানো সুবাসে বুকের মধ্যে দামামা বাজার প্রহর কি আজও নেই? কী জানি! েশ্বতপদ্মাসনা দেবীর দিকে চাইলে এখনও কত মধুর মধুর ধ্বনি বাজে। নিভৃতবাসিনী বীণাপাণির অমৃতমুরতিমতি বাণীর চেয়ে অনেক সজীব আমাদের সেই অভিমানী বিদ্যার্থীজীবনের শুভ্র স্মৃতি। শুভ্রই তো, তাতে এক ফোটা স্বার্থকলঙ্কের দাগ লাগেনি আজও। েশ্বতশুক্লবসনা সেই দেবীর মূর্তিশৈলীতে এখনও তেমন ৈস্বরহস্তক্ষেপ চোখে পড়ে না, যতটা পড়ে অন্যান্য দেবদেবীদের মূর্তির হালফিল গঠনে।

 আর একটা কথা কবুল করা ভাল। মুখে যতই বলা হোক মা সরস্বতী, কিন্তু সরস্বতীর মূর্তিতে তেমন কোনও মাতৃভাব জাগে না। পেখম-মেলা হঁাসের বাহারি ঘেরাটোপে দঁাড়ানো বা বসা সার দেওয়া একমেটে, দোমেটে করা সরস্বতী মূর্তি রয়েছে কুমোরবাড়ির রোয়াকে, উঠোনে, দালানে— রৌদ্রপক্ব হচ্ছে, এমন দৃশ্য দেখতে দেখতেই তো আমাদের শীতের পাড়ায় পথচলা। তার পরে খড়ি বুলনো, ঘামতেলের পালিশ, চোখ দেওয়া— তার পরে সেই চোখ ঠোট আকা
মুখে কাগজের ঠুলি পরিয়ে খেদ্দরের প্রতীক্ষা, দরদাম। অবশেষে ভ্যান রিকশায় তুলে প্রতিমা আনয়ন।

আশ্চর্য যে, নানান স্কুল থেকে ছেলেমেয়েরা এসে সাদা কার্ড খামে পুরে সরস্বতী পুজোর নেমন্তন্ন এখনও করে যায়। সেখানে গেলে সত্যি সত্যিই আন্তরিক ভাবেই খিচুড়িভোগ মেলে আজও। তাই বলছিলাম সব চেয়ে অমলিন অম্লান হল এই দেবীটির পূজার্চনা।

কিন্তু, আমাদের ছোটবেলায় সরস্বতীর মূর্তিপুজো ক্লাবে বা স্কুলে হলেও বাড়িতে হত বইপুজো। একটা কাঠের জলচৌকিতে আসন পেতে তাতে রাখা হত বই, দোয়াতে দুধ ভরে তাতে থাকত খাগের কলম আর যবের শিসগাছ। পুরুতমশাই এসে সংস্কৃত মন্ত্র পড়ে তাতেই অাবেশ তৈরি করতেন। তঁার সঙ্গে বাড়ির পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা সমস্বরে হেঁকে বলত:
সরস্বত্যৈঃ নমো নিত্যম্‌
ভদ্রকাল্যৈ নমো নমঃ।
বেদবেদাঙ্গ বেদান্ত
বিদ্যাস্থানেভ্য এব চ।।

তিন বার পুষ্পাঞ্জলি দেবার জন্যে ঝুরো ফুলের আয়োজন থাকতই। দূর থেকে যারা ফুল ছুড়ত বইকে লক্ষ্য করে, তাদের কারও কারও লক্ষ থাকত ঠাকুরমশাইয়ের টিকির দিকে। ফলে, গাদাফুলের পাপড়িশোভিত সেই মানুষটিকে দেখে ভারী কৌতুক লাগত। আমাদের নজর থাকত অবশ্য বড় পরাতের প্রসাদের থালার দিকে। পরে তার থেকেই হবে প্রসাদ বিতরণ, যাতে থাকবে খই-ঁচিড়ে-আখের টুকরো-খেজুর-কুল-সাদা বীরখণ্ডী-সাদা কদমা-সেন্দশ-মুড়কি। এই মুড়কি আবার দু’রকম। কনকচূড় ধান থেকে খই বানিয়ে তাতে চিনির রস আর এলাচের গন্ধ দিয়ে চিনির মুড়কি। আর এক রকম মুড়কি হত নতুন খেজুর গুড় দিয়ে। এখন আর এ সব ভক্ষ্যের কী-ই বা মহিমা আছে? ক্যাডবেরি-দাদুদের দীয়তাং ভুজ্যতাং দানে নাতিনাতনিদের রুচি পালটে গেছে। নতুন গুড়ের পায়েসের সাধ্য কী যে, নবীন কিশোরদের আকর্ষণ করে!

তবে কি সরস্বতী পুজো আজ কেবল আমাদের দুর্মর স্মৃতিকাতরতা? তা কেন? তবে, পুজোটা অনেক পৌত্তলিক হয়ে গেছে। নানা সাইজের মূর্তিবিপণন এখন দেখবার মতো। আট-দশ ইিঞ্চ থেকে এক দেড় ফুট উচ্চতার মূর্তি শয়ে শয়ে ওই তো ক’দিন দেখলাম েট্রন থেকে উেল্টাডাঙার খালপাড়ে রোদ পোয়াচ্ছে। সাদা রঙে পোচ মেরে হালকা ফিনিশ দিয়ে ওই সব মূর্তি বিকোবে ইতিউতি। ছাচের ঠাকুরের বাইরে একটু বড় মূর্তিও অঢেল মিলবে পাড়ার রকে বা বাজারের কোল ঘেষে। ছেলে বা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাবা বা কাকা সেই ঠাকুর কিনে রিকশায় চাপিয়ে বাড়িতে আনবেন। এ বারে পুরো ফ্যামিলি অ্যাফেয়ার। মেঝেয় আলপনা দেওয়া, মূর্তির মাথায় চঁাদোয়া টাঙানো, ধূপ-দীপ-শেঙ্খর আয়োজন, দশকর্মা ভাণ্ডার থেকে পূজোপচার কেনা। অনেক পরিবারে আবার ঘরের উচু বাঙ্কে রাখা থাকে গত বছরের পূজিত মূর্তি— এ বার সেটি বিদায় দিয়ে পুজোর পরে হালের মূর্তিটি বসবে একবছরী মেয়াদে। খাটি পারিবারিক পুজো, শুধু বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী তো নন, সারা পরিবারের বিদ্যার্থীদের যেন গাইডিং ডিইটি। মেয়েকে ইস্কুলে পৌছে দিয়ে ঋতুপর্ণা বললেন মধুমিতাকে, এ বারে ভাল করে পুজো করাতে হবে, সামনের বারে সোমদত্তার মাধ্যমিক তো!

মধুমিতা বললেন, আমার ও বালাই চুকে গেছে। ছেলে জয়েন্ট পেয়ে চলে গেছে বাইরে।

তার মানে, সরস্বতী পুজো ব্যাপারটাও কি আর সব কিছুর মতো গিভ অ্যাণ্ড টেক হয়ে গেল না কি? এটা ঠিক যে, এই পুেজায় এখনও বারোয়ারির আগ্রাসন ঘটেনি, ক্লাবও সংখ্যায় কমছে। কিন্তু পুজোর দিন থেকে কর্তা-গিিন্নর টেনশন বাড়তেই থাকে— পুজোর পুরুত নিয়ে টেনশন।

সত্যিই বছরে এই একটা দিনের সকাল দেখবার মতো। দ্রুত ভ্রাম্যমাণ বা সাইকেলবিহারী পুরোহিত মুক্তকচ্ছ হয়ে ছুটছেন বাড়ি-বাড়ি আর তঁাকে আকশির মতো আটকে ধরে কাতর কেণ্ঠ বিনতি: িপ্লজ, ঠাকুরমশাই একটুখানি ফুল ফেলে যান, িপ্লজ, বাচ্চাগুলো অঞ্জলি দেবে বলে উপোস করে আছে।

এক দিকে অনিচ্ছুক পূজারী, আর এক দিকে অসহায় গেরস্থ। দেখবার মতো সেই টানাপোড়েন। লক্ষ করে দেখা যাবে, সারা বছর যাদের অন্য বৃত্তিতে দেখি, এ দিন তাদের হঠাৎ যজমানি। খুব একটা ব্রাহ্মণোচিত নয় যাদের জীবনযাপন— নোংরা বস্ত্র, ক্ষৌরী না করা মুখ, অশিক্ষিত যে কোনও ধাচের এক জন বামুনঠাকুর হাতের কাছে পেলে আর রক্ষা নেই— কাছা ধরে পুরুতের আসনে তাকে বসাতে কোনও িদ্বধা নেই। আর, কী সব আত্মগর্ব গেরস্থদের! হু, আমাদের পুজো সাতসকালেই হয়ে গেছে। কোথাও বাধা পুরুতমশাই কোনও রকমে ঠাকুরের পায়ে ফুল নৈবেদ্য নিবেদন করে বেরিয়েই দেখেন তঁাকে গ্রেফতার করতে টু-হুইলার নিয়ে আর এক গেরস্থ হাজির। কাতর কেণ্ঠ পুরুত বলেন, পাশেই বোসবাড়িতে পুজোটা সেরে দিই ভাই, একটু দঁাড়াও লক্ষ্মী ভাইটি আমার।

ভাইটি তো আসলে তত লক্ষ্মী নন, হাফ মস্তান। তাই সংক্ষেপে বলে, ‘ও সব বাতেলা রাখুন। সোজা উঠে পড়ুন ব্যকসিটে।’ রইল বোসবাড়ি। ক্রমে ক্রমে একটার পর একটা কথা খেলাপের বৃত্তান্ত। আর সকালে পুজোর পরে সন্ধ্যায় এসে আরতি? সে তো দিবাস্বপ্ন। যাদের বাড়ির পুরুত ছিনতাই হয়ে যায়, তাদের শুরু হয় নানা ভোগািন্ত আর গরু খোজা।

ব্যাপারস্যাপার দেখে আমার এক সমাজবিজ্ঞানী সহকর্মী বলেছিলেন, ‘আচ্ছা, সরস্বতী পুজোটা সািত্ত্বক ভাবে মন্ত্র পড়ে কোনও অব্রাহ্মণ যদি করেন তবে, ক্ষতি কী?’ তঁাকে তো মূল কথাটাই বোঝানো যাবে না যে, এ ভাবে পুজোর প্রয়োজনটাই বা কী?

আসলে ডিম্যাণ্ড অ্যাণ্ড সাপ্লাইয়ের সমস্যা। যত পুজো বেড়েছে, তত পুরুত বাড়েনি। কাজেই পার্ট টাইম পুরুত কিংবা প্যারা-িপ্রস্ট, যেমন এখন প্যারা-টিচার। নাচার গেরস্থ কেন যে দিগ্‌দারি করতে ঘরে ঘরে বিদ্যার দেবীর আরাধনা শুরু করলেন পাইকারি ভাবে? এ দেশে তো ছাই সরস্বতীর মূর্তিপুজোই ছিল না। অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের লেখা ‘সরস্বতী’ বইটি ঘাটলে এই বিদ্যাদেবী সম্পর্কে নানা কূটকচাল তথ্য বেরিয়ে পড়বে। তার মধ্যে দুটো খবর বলছি। তিনি লিখছেন ১৩৪০ বঙ্গাব্দে: ‘সত্তর-আশি বৎসর পূর্বে কলিকাতায় গণিকাদের বাড়িতে কলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী রূপে সরস্বতী পূজায় বেজায় ধুম হইত।’ এখানে রঙের ওপর রসান চড়িয়ে বলা যায় গণিকালয়ে দুটো পুজোর খুব রমরমা ছিল— কার্তিক আর সরস্বতীর। বিদ্যাভূষণমশাই আর একটা খবর দিয়েছেন: ‘সরস্বতী নিজে স্ত্রী দেবতা; কিন্তু স্ত্রীলোকেরা অঞ্জলি দিতে পাইত না। বাঙালির বোধহয় ভয় ছিল, পাছে মেয়েরা দেবীর অনুগ্রহে লেখাপড়া শিখিয়া ফেলে।’

এ সব ফুটকাটা মন্তব্য পড়লে এখনকার মা লক্ষ্মীরা বেজার হবেন। কিন্তু আমার মনে পড়ে বাণভেট্টর লেখায় সরস্বতীর প্রণয়কথা পড়েছিলাম। সতর্ক পাঠকের কি মনে পড়বে না বিভূতিভূষণের ‘মেঘমল্লার’ গেল্প কেমন করে সরস্বতীকে মর্তবিন্দ করা হয়েছিল? সরস্বতীকে নিয়ে লোকায়ত কাহিনিও অনেক শুনেছি। বলাহাড়ি সম্প্রদায়ের কথক বিপ্র হালদার মুখে মুখে তাদের ধর্মের সৃষ্টিতত্ত্ব বলে, দুর্গা পরিবারের প্রসঙ্গ এই বলে শেষ করেছিল যে, ‘আর রইল বাকি দুজনা, কাত্তিক আর সরসতী— চিরকুমার আর চিরকুমারী’।
তা হলে এই চিরকুমারী দেবীটিকে নিয়ে মাজাঘষা কিছু কম হয়নি। তাঁকে প্রণতি জানিয়ে যে শ্লোকটা সবাই আওড়ায় তার বর্ণনা মোটামুটি:


জয় জয় দেবী চরাচর সারে
কুচযুগ শোভিত মুক্তাহারে।
বীণারিঞ্জত পুস্তক হেস্ত
ভগবতী ভারতী দেবী নমেস্ত।।

এ মন্ত্র থেকে সে বার ঘটল এক মহা দুর্ঘট। সমীরের ছোটভাই কোেত্থকে ধরে এনেছে এক পুরুত। তাকে দেখলে মোটে ভক্তি আসে না। অং বং করে পুজো সাঙ্গ করে ওই প্রণতি মেন্ত্র এসে ভশ্চায্যি বামুন বলে বসলেন:
 

জয় জয় দেবী চলাচল সারে
কচুযোগীয় শোভিত মুকুতা হারে।

কী বললে? কী বললে? কচুযোগীয়? এ বেটা কিস্যু জানে না— বলে তেড়ে উঠলেন সমীরের দাদা। সব কথা শুনে সমীরের বাবা বললেন, তুমি ব্রাহ্মণ?
আজ্ঞা হাঁ, বামুন বটি।
বামুন? বলো তো কী গোত্র তোমার?
আজ্ঞে ওই কচ্ছপ গোত্তর।
কচ্ছপের হাতে সরস্বতী পুজো? দাদার গর্জন আর থামে না।

সত্যি, দরকার কী অত সব দেবভাষার ভড়ং-এ? আজ থেকে বিশ বছর আগে আমার ছাত্র অলক (তখনই রবীন্দ্রভারতীর অধ্যাপক) ভৌমিক তার বাড়িতে ডেকেছিল আমাকে সরস্বতী পুজোর উপলক্ষে। গিয়ে দেখি দিব্যি সাজানো গোছানো পরিবেশ। চমৎকার সুঠাম একটি মূর্তি। স্নান সেরে কোরা ধূতি নকশি পাঞ্জাবি পরে অলক বসল পুরোহিতের আসনে। আচমন নেই, গঙ্গাজল নেই, ধূপদীপ আছে, আছে ভক্তি আর অনুরাগ। সঞ্চয়িতা খুলে রবীন্দ্রনাথের ‘পুরস্কার’ কবিতা থেকে আবৃত্তি করল:
তুমি মানসের মাঝখানে আসি
দাঁড়াও মধুর মুরতি বিকাশি
কুন্দবরণ সুন্দর হাসি
বীণা হাতে বীণাপাণি।

চলল একটানা বাংলা ভাষায় সরস্বতী-বন্দনা। তার পরে সবাই মিলে গাওয়া হল: মধুর মধুর ধ্বনি বাজে। কই, কোথাও কোনও অপূর্ণতা তো বাজল না! মন ভরে উঠল।

বাগ্‌দেবী কী ভাবে যে কাকে কখন কৃপা করেন, তার একটা বৃত্তান্ত পেশ করি এ বারে। জঙ্গিপুরের শরৎপণ্ডিত মশাই ছিলেন েগৗরবর্ণ ব্রাহ্মণ, তায় তেজি মানুষ। সবাই তঁাকে বলত ‘দাদাঠাকুর’। রঙ্গব্যঙ্গের ভগীরথ ঘুরতেন ফিরতেন খালি পদে। পরনে খদ্দরের খাটো ধুতি, ঊধ্বার্ঙ্গে সাদা খদ্দরের চাদর। ‘বিদূষক’ নামে একটি কাগজের তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, সম্পাদক, কেম্পাজিটর, প্রিন্টার আর ক্যানভাসার।

তখন ঘোর সাহেবি আমল। দাদাঠাকুর ‘রসের বোতল’ নামে একটা বই ফেরি করছিলেন ধর্মতলা ষ্ট্রিটে নেচেকুদে। গোরা পল্টনরা ভাবল লোকটা বোধহয় স্বদেশী প্রচার করছে। খপ করে চেপে ধরতেই দাদাঠাকুর মা সরস্বতীকে স্মরণ করে তাৎক্ষণিক বুদ্ধিতে গান ধরলেন ইংরেজিতে মুখে মুখে বানিয়ে:
হিউমার স্যাটায়ার উইট
আর ইন মাই পাব্লিকেশন
জেন্টলম্যান টেক দি বট্‌ল্‌
ফর ইয়োর রিল্যাক্সেশন।

সাহেবরা ভারী মজা পেল সেই নাচে গানে। বলল: গো অন পণ্ডিট গো অন। দাদাঠাকুর প্রথমে ভাবলেন এ কী গেরো! পরে মা বাগ্‌বাদিনীর শরণ নিয়ে আবার বানালেন:
ইট ইজ অব নাইস রাইম
দেয়ার ইজ নো ভাইস ক্রাইম
অ্যাট ইয়োর লেজার টাইম
রিড ইট ফর রিক্রিয়েশন।

গোরা সাহেব রস পেয়ে আর কি চাড়ে? গো অন গো অন শুনে দাদাঠাকুর বাগ্‌দেবীর কৃপায় সাঙ্গ করলেন:
দি গেট আপ ইজ ভেরি নাইস
টু আনাস ওনলি প্রাইস
ইফ ইউ ক্যান স্যাক্রিফাইস
নো কজ অব ল্যামেেন্টশন।

হায় রে, সে সব মুখে মুখে মুখরক্ষার দিন কবেই শেষ। অক্ষরের পরাক্রমও নাকি শেষ হয়ে এল। গত বছর থেকে সরস্বতী পুজোয় সুদীপের মা ভক্তি ভরে ছেলের কিম্পউটারে পুজোর গাদাফুল ছোয়াচ্ছেন।

এটা ঠিক যে, অন্য দেবীর কাছে রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি বললেও এই এক দেবীর কাছে শুধু বিদ্যাং দেহি কামনা আমাদের। সে বিদ্যা অবশ্য আন্তর্জালের বিশ্ববিদ্যা। তার কৃপায় কিন্তু লক্ষ্মী আর সরস্বতীকে একই সঙ্গে লাভ করা যায়। কাজেই, এ কালের মা সরস্বতীর পদতলে আর বই রেখে লাভ নেই, কারণ ভেতরে ভেতরে এই হংসবাহনা মা যা হইয়াছেন, তার বিগ্রহ হল কিম্পউটারবাহনা বিশ্ববিদ্যাদায়িনী। আসুন, সরস্বতীপুজোর অনধ্যায়ের দিনে একটা নতুন অধ্যায় শুরু করি।

সৌজন্যে: আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ১ ফাল্গুন  ১৪১১ রবিবার ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৫

Up
Up