[+] Tools

Color Theme

Font Size

Results

Cookie color (CSS):

Cookie width (CSS):

Cookie fontsize(CSS):


Use the reload link, to see, if the cookie works!

Reload page !
Universatil template, by 55thinking
Sreemadbhagbad Gita Sangha

শ্রীরামঠাকুর ছিলেন সমাজ সংস্কারক

Attention: open in a new window. PDFPrintE-mail

Last Updated (Tuesday, 30 November 1999 00:00) Written by Radha Krishna Tuesday, 26 January 2010 00:31

শ্রীরামঠাকুর ছিলেন সমাজ সংস্কারক
||ভজন নাগ||

১৮৬০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার ডিঙ্গামানিক গ্রামে রাধামাধব চক্রবর্তী ও কমলাদেবীর সন্তান হিসাবে রামঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁরা ছিলেন চার ভাই ও এক বোন–কালীকুমার, কাশীমণি দেবী, জগবন্ধু এবং যমজ রাম ও লক্ষ্মণ। দুই যমজ ভাই ছিলেন অকৃতদার।

ছেলেবেলায় গ্রামের পাঠশালায় বাংলা শেখার মাধ্যমে রামঠাকুরের শিক্ষা গ্রহণ শুরু হয়। পিতা তন্ত্রসাধক ছিলেন বলে বালক বয়সেই রামায়ণ, মহাভারত এবং পুরাণ চর্চায় তিনি গভীর মনোযোগী হয়ে ওঠেন। তাঁর স্মৃতি শক্তি ছিল প্রখর। দুই যমজ ভাইয়ের একই সঙ্গে উপনয়ন হয়। ত্রিসন্ধ্যাবন্দনা থেকে সব করণীয় কাজ তিনি একাগ্রতার সঙ্গে পালন করতেন।

রামঠাকুরের পিতার গুরুদেব ছিলেন মৃত্যুঞ্জয় ন্যায়পঞ্চানন। তিনি রামঠাকুরকে খুব স্নেহ করতেন। মাত্র আট বছর বয়সে রামঠাকুর তাঁর পিতাকে হারান। পিতার মৃত্যুর কয়েক দিন পর গুরুদেবের অসুস্থতার খবর শুনে কমলাদেবী যমজ পুত্র রামলক্ষ্মণকে সঙ্গে নিয়ে তাঁকে দেখতে যান। তাঁদের সামনেই গুরুদেব মৃত্যুঞ্জয় ন্যায়পঞ্চানন মারা যান। কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রথমে পিতা, পরে গুরুদেবের মৃত্যুতে বালক রামঠাকুরের মনে তীব্র আলোড়ন সৃিষ্ট হয়। মানুষের জীবনমৃত্যু কেন্দ্রিক নানা প্রশ্ন তাঁর মনে ঘুরপাক খেতে থাকে। কোনও এক অক্ষয় তৃতীয়া তিথিতে স্বেপ্ন দেখা দিয়ে গুরুদেব তাঁকে সিদ্ধ মন্ত্র দেন। এর পর তাঁর জীবনে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। সিদ্ধ পুরুষের মতো তিনি মাঝে মাঝেই ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়তেন।

মানসিক ভাবাবিষ্ট রামঠাকুর ১৮৭২ সালে সকলের অজ্ঞাতে অজানাকে জানার লক্ষ্যে গৃহত্যাগী হন। অনুসন্ধিৎসু বালক পায়ে হেঁটে বনজঙ্গলপাহাড়নদীর অজানা অচেনা পথ পেরিয়ে অবশেষে পেঁৗছালেন অসমের কামাক্ষ্যাদেবীর মন্দিরে। অক্ষয় তৃতীয়া তিথিতে কামাক্ষ্যা মন্দিরে পেঁৗছে গুরুদেবের দেওয়া সিদ্ধ নাম এক মনে জপ করার সময় তিনি পরিষ্কার শুনতে পেলেন, গম্ভীর গলায় তাঁকে কে যেন ডাকছে। রাম, রাম–ডাক শুনে তাঁর বুঝতে অসুবিধা হল না, যে গুরুদেবের সিদ্ধ নাম তিনি স্বেপ্ন পেয়েছেন, এই ডাক হল তাঁরই।

ডাকের অমোঘ টানে সাড়া দিয়ে বাইরে এসে রামঠাকুর দেখেন জটাধারী, দীর্ঘাঙ্গী এক জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ সামনে দাঁড়িয়ে। তাঁকে গুরু হিসাবে বরণ করে রামঠাকুর প্রণাম করলেন। গুরুও তাঁর যোগ্য শিষ্যকে আলিঙ্গন করলেন। এর পর শুরু হল গুরুর সঙ্গে অজানার সন্ধানে অন্তহীন পথে যাত্রা।

কিশোর রামঠাকুর গুরুর নির্দেশে পাহাড়, মরুপথ পেরিয়ে গভীর অরণ্যের নিরালায় তপস্যায় বসলেন। শোনা যায়, হিমালয় পর্বতমালায় কখনও কৌশিকাশ্রম, কখনও বশিষ্ঠাশ্রম সহ বহু অজানা স্থানে বছরের পর বছর তপস্যা করে এবং তপস্যারত মুনিদের সেবাপূজায় সময় কাটিয়ে তিনি অষ্টসিদ্ধি অর্জন করেন। এর পর গুরুর নির্দেশে লোকালয়ে ফিরে মানবসেবায় নিয়োজিত হন। গুরুর কৃপায় তাঁর কাছে অগম্য স্থান এবং অেজ্ঞয় বস্তু বলে কিছু ছিল না। এর পর গুরু তাঁকে মাতৃসেবার জন্য বাড়ি ফিরতে আদেশ করেন। গুরুর নির্দেশ শিরোধার্য করে নিজের রোজগারে মাতৃসেবার জন্য তিনি নোয়াখালির এক ইঞ্জিনিয়ারের বাড়িতে পাচকের কাজ নেন।

রামঠাকুর নিষ্ঠার সঙ্গে রান্নার কাজ করতেন। সকলকে নিজের হাতের রান্না খাবার খাইয়ে আনন্দ পেলেও তিনি নিজে এ সব কিছুই খেতেন না। সামান্য দুধ এবং দু’এক টুকরো ফলাহারেই তাঁর শরীর ছিল সুস্থ ও সবল। অচিরেই কর্মদাতা ইঞ্জিনিয়ার বুঝতে পারেন, তাঁর বাড়ির পাচক কোনও সামান্য মানুষ নন–এক মহাপুরুষ। রামঠাকুরের স্বরূপ জানার পর তিনি তাঁকে আর পাচকের কাজ করতে দেননি।

এর পর রামঠাকুর ফেনি শহরে এক ওভারসিয়ারের অধীনে সরকারি কাজ নেন। সেই সময় নানা জাতের বহু মহিলা কর্ম সূত্রে ফেনি শহরে থাকতেন। তাঁদের আপন জন বলে কেউ ছিল না। রামঠাকুর নিজের হাতে রান্না করে এই সব মহিলাকে যত্ন সহকারে খাওয়াতেন। এঁদের কেউ অসুস্থ হলে মাবোনের মর্যাদায় সেবা করতেন। রামঠাকুরের এই সেবাপরায়ণতা দেখে তখনকার মহকুমা হাকিম কবি নবীনচন্দ্র সেন রামঠাকুর সম্পর্কে লিখেছেন, পরসেবায় ছিল তাঁর পরমানন্দ।

জেলখানার ইটখোলার ঘরে পাবলিক ওয়ার্কস প্রভুদের আনন্দ দিতে কখনও কখনও বারাঙ্গনারা হাজির হত। রামঠাকুর তাদেরও রান্না করে খাওয়াতেন, মাতৃজ্ঞানে সেবাযত্ন করতেন। তৎকালীন কুসংস্কারচ্ছন্ন সমাজে যেখানে ছোঁয়াছুঁয়ির নামে শুচিবায়ুগ্রস্ত মনোভাব, বর্ণ বৈষম্যের মতো কুপ্রথার প্রভাব ছিল, তখন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পরিবারের অকৃতদার যুবকের এ হেন আচরণকে সমাজ বিপ্লবের এক উদাহরণ হিসাবে উেল্লখ করা যেতে পারে।

কবি নবীনচন্দ্র সেন ‘আমার জীবন’ বইয়ের চতুর্থ ভাগে ‘প্রচারক না প্রবঞ্চক’ অংশে রামঠাকুরের কিছু অলৌকিক ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রাণিকুলের প্রতি রামঠাকুরের ছিল যথেষ্ঠ মায়ামমতা। ফুলের সুগন্ধের মতো তাঁর আধ্যাত্মিক জ্ঞান, যৌগিক শক্তি, নানা বিভূতি প্রকাশিত হয়েছে।

রামঠাকুর তাঁর জীবনের অর্ধেক সময় লোকচক্ষুর আড়ালে গভীর যোগ সাধনায় মগ্ন ছিলেন। সাধনার মাধ্যমে যে মহাসত্য তিনি উপলিব্ধ করেছিলেন, তা বাকি ৪০ বছর (১৯০৮১৯৪৯) সকলের মঙ্গলে লোকালয়ে বিলিয়েছেন। তাঁর কাছে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শুচি, অশুচির কোনও ভেদ ছিল না। সব ঘটনাই তিনি নিরপেক্ষ দৃিষ্টতে ব্যাখ্যা করে ভক্তদের বোঝাতেন। প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন সমভাব নিরপেক্ষ শক্তির আধার।

মন্দির, মসজিদ, গির্জায় নয়, রামঠাকুর অবস্থান করেছেন ভক্তের প্রয়োজনে, ভক্তের আলয়ে। লোকালয়ে থাকার প্রায় ৪৫ বছর তিনি মানব মুক্তির দিশা বিতরণ করেছেন। ভক্তদের তিনি বলতেন, আমি আপনাদের জন্য চাইখ্যা ‘নাম’ আনছি। বর্তমানে সদাব্যস্ত গার্হস্থ সমাজে এমন এক সহজ সরল অনাড়ম্বর ‘নাম’ করার নির্দেশ এবং সত্যের প্রতি অনুরাগ পেঁৗছে দিতে পারে কৈবল্য মুক্তি। বৈষ্ণব, শৈব এবং শাক্ত মতে প্রয়োজনভিত্তিক নাম বিলি করে তিনি প্রকৃত অর্থেই ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানব সম্প্রদায়ের প্রচার করে গিয়েছেন। তিনি শুধু আধ্যাত্মিক গুরুই নন, তিনি জন্মজন্মান্তরের মা, বাবা ও বন্ধু।

রামঠাকুরের শাশ্বত বাণী–শান্ত হইলেই শান্তি পাওয়া যায়। জন্মান্তরের গতাগতির অবসানে ‘নাম’ই এক মাত্র সম্বল। নাম চিন্তামনিঃ কৃষ্ণচৈতন্য রসবিগ্রহঃ/নিত্য শুদ্ধ নিত্য মুক্ত ভিন্নাত্মা নাম নামিনোঃ। নিত্য শুদ্ধ, নিত্য মুক্ত নাম নির্বিচারে করা যায় যে কোনও স্থানে, যে কোনও সময়ে, যে কোনও অবস্থায়। নামের সঙ্গে থাকিলে সকল অভাব দূর হইয়া ঋণ মুক্ত হইলে তাহাকে আর দেহ ধারণ করিয়া সংসারে আসিতে হয় না। ইহাই কৈবল্য মুক্তি।

রামঠাকুরের কথায়, দীক্ষা হল দেখা। এর দেওয়ানেওয়া কিছু নেই, নিজের জিনিস নিজেকে জানিয়ে দেওয়া। কামনাবাসনা গুরুদক্ষিণা দিতে হয়। আমি উপদেষ্টা নই, দৃষ্টান্ত মাত্র।

রামঠাকুরের নির্দেশে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ১৯৩০ সালে কৈবল্য ধাম এবং ১৯৪২ সালে কলকাতার দক্ষিণ শহরতলির যাদবপুরে কৈবল্যধাম তৈরি হয়। এ ছাড়া, ১৯৪৩ সালে তাঁর জন্মভিটা ডিঙ্গামানিক গ্রামে সত্যনারায়ণ সেবা মন্দির তৈরি হয়। নামপ্রার্থীদের জন্য এক নির্দিষ্ট প্রথায় মোহন্ত পরম্পরা মারফত নাম বিতরণের তিনি ব্যবস্থা করে গিয়েছেন।

১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি দিল্লিতে মহাত্মা গান্ধী গুলিবিদ্ধ হয়ে ‘হে রাম’ বলে প্রাণত্যাগ করলেন। ঠিক একই সময় নোয়াখালির চৌমুহনীতে ভক্তদের উদ্দেশে ঠাকুর বললেন, মহাত্মা গান্ধী চইল্যা গেলেন। গান্ধীর আর জন্ম হইবো না। ১৯৪৯ সালের ১ মে অক্ষয় তৃতীয়ার পুণ্য লগ্নে চৌমুহনীতে অগণিত ভক্তকে চোখের জলে ভাসিয়ে ৯০ বছর বয়সে শ্রীশ্রীঠাকুর অনন্তলোকে যাত্রা করেন। রামঠাকুরের একনিষ্ঠ ভক্ত ডঃ যতীন্দ্রমোহন দাশগুপ্তকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সমুদ্রেরও একটা কূল আছে, কিন্তু তোমার ঠাকুরের কোনও কূলকিনারা নেই।

ঊনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর ভারতীয় সমাজ জীবনে কুসংস্কার, ব্রিটিশ রাজশক্তির সৃষ্টি করা ভেদ নীতি ও দাঙ্গার বিরুদ্ধে শুধু আধ্যাত্মিক চেতনায় মানুষকে বলীয়ান করাই নয়, সমাজ সংস্কারের এক সার্থক রূপকার ছিলেন রামঠাকুর। ভক্তদের বিভিন্ন প্রেশ্নর সমাধানসূচক জবাব তিনি যে সব চিঠিতে দিয়েছেন, তা নিয়ে তিন খণ্ডে ‘বেদবাণী’ প্রকাশিত হয়েছে। এ বছর রামঠাকুরের আবির্ভাবের ১৫০তম বছর।

সৌজন্যে: দৈনিক বর্তমান, কলকাতা, মঙ্গলবার ২৬ জানুয়ারী ২০১০, ১২ মাঘ ১৪১৬

Up
Up