লেখক- শ্রী স্বপন কুমার রায়
মহা ব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ ব্যাংক৷
সাধারণ সম্পাদক, শ্রী শ্রী গীতাসংঘ, মতিঝিল শাখা, ঢাকা৷
--------------------------------------
অধ্যায়টির নাম থেকে মনে হতে পারে যে এখানে হয়তো শুধু জ্ঞানের কথাই আলোচিত হয়েছে। প্রকৃত পক্ষে এ অধ্যায়ে জ্ঞান বিষয়ক আলোচনা ছাড়াও আরও কয়েকটি বিষয় যেমন অবতার তত্ত্ব, চতুর্বর্ণের উৎপত্তি তত্ত্ব, নিষ্কাম কর্ম তত্ত্ব - ইত্যাদিও আলোচিত হয়েছে। ভগবান অবতার রূপে কেন ধরাধামে আসেন সে বিষয়ে বলতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণ বলেন যে যখনি ধর্মের গ্লানি হয় এবং অধর্মের অভ্যুত্থান ঘটে তখনই দুষ্টদিগের বিনাশ সাধনের মাধ্যমে সাধুগণের পরিত্রাণ এবং ধর্মকে পুনঃসংস্থাপনের উদ্দেশ্যে যুগে যুগে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন। তিনি জন্ম রহিত হওয়া সত্ত্বেও স্বীয় প্রকৃতিতে অধিষ্ঠান করে আত্মমায়ায় আবির্ভূত হন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই দিব্য জন্ম ও কর্মের বিষয়টি যিনি তত্ত্বত জানেন তিনি মুক্তি লাভ করে দেহান্তে তাঁকেই প্রাপ্ত হন। অতপর, শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন যে জগতে গুণ ও কর্ম অনুসারে চতুর্বর্ণের সৃষ্টি তিনি-ই করেছেন। কিন্ত্ত সৃষ্টির রচনাদি কর্মের কর্তা হবার পরও তাঁকে অকর্তা বা অবিনাশী পরমেশ্বর বলেই জানতে উপদেশ দিলেন। নিষ্কাম কর্ম প্রসঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ বললেন যে কর্ম করতে হলে সে কর্মের স্বরূপ জানা প্রয়োজন। কর্মের স্বরূপ জানতে হলে আবার কর্ম, অকর্ম ও বিকর্ম সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন, কারণ কর্মের গতি দুর্জ্ঞেয়। লোকে কর্তব্য বোধে যা কিছু করে -তাই কর্ম। কিন্তু কর্মী যখন ফলের ফলাকাংখা করে কিন্তু কর্মী যখন ফলের ফলাকাংখা করেন না তখন ঐ কর্ম মূলত অকর্মে রূপান্তরিত হয়। আর শাস্ত্র বিরুদ্ধ যে কর্ম তাকেই বিকর্ম বলা হয়। কর্মের এই প্রকৃত স্বরূপ জানাই কর্ম বিষয়ক জ্ঞান। এই জ্ঞানের অধিকারী হলেই কেবল লোকে যথাযথ ভাবে কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে ভগবৎ কৃপা লাভ করতে পারে। তাই শ্রীকৃষ্ণ বললেন যে, যিনি কর্মে অকর্ম এবং অকর্মে কর্ম দর্শন করেন, মনুষ্যের মধ্যে তিনিই বুদ্ধিমান এবং তিনি যোগী এবং সমস্ত কর্মের সম্পাদনকারী। এভাবে কর্ম সম্পাদনের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় জ্ঞান সম্পর্কে আলোচনা করতে করতে শ্রীকৃষ্ণ জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়ে অর্জুনকে উপদেশ দিলেন। তিনি বললেন যে কর্মফলাকাঙ্খীগণ নানাবিধ ফল কামনার্থে নানাবিধ যজ্ঞ করে থাকেন,যেমন- দ্রব্যদানরূপযজ্ঞ, তপঃযজ্ঞ, স্বাধ্যায় যজ্ঞ ইত্যাদি। কিন্তু এসকল যজ্ঞের মধ্যে জ্ঞানযজ্ঞই শ্রেষ্ঠ। কারণ ফলসমেত সমস্ত কর্ম নিঃশেষে জ্ঞানে পরিসমাপ্ত হয়। ইহলোকে জ্ঞানের ন্যায় পবিত্র আর কিছু নেই, কেননা জ্ঞান উপযুক্ত কালে আপনি নিষ্কাম কর্মযোগীর অন্তরে উদ্ভাসিত হয়। কর্মযোগী তখন আত্মজ্ঞান লাভ করে শিঘ্রই পরম শান্তি লাভ করে থাকে। এভাবে চতুর্থ অধ্যায়ে মোট ৪২ টি শ্লোকের মাধ্যমে অবতারতত্ত্ব, বর্ণতত্ত্ব, কর্ম ও জ্ঞান বিষয়ক ৪টি বিশেষ গুরুত্ব পূর্ণ প্রসংগ আলোচিত হয়েছে। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।
অনুবাদ: পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন- আমি পূর্বে সূর্যদেব বিবশ্বানকে এই অব্যয় নিষ্কাম কর্মসাধ্য জ্ঞানযোগ বলেছিলাম। সূর্য তা মানবজাতির জনক মনুকে বলেছিলেন এবং মনু তা ইক্ষ্বাকুকে বলেছিলেন।
অনুবাদ: এভাবেই পরম্পরা মাধ্যমে প্র্রাপ্ত এই পরম বিজ্ঞান রাজর্ষিরা লাভ করেছিলেন৷ কিন্তু কালের প্রভাবে পরম্পরা ছিন্ন হয়েছিল এবং তাই সেই যোগ নষ্টপ্রায় হয়েছে।
অনুবাদ: যদিও আমি জন্মরহিত এবং আমার চিন্ময় দেহ অব্যয় এবং যদিও আমি সর্বভূতের ঈশ্বর, তবুও আমার অন্তরঙ্গা শক্তিকে আশ্রয় করে আমি আমার আদি চিন্ময় রূপে যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।
অনুবাদ: হে অর্জুন ! যিনি আমার এই প্রকার দিব্য জন্ম ও কর্ম যথাযথভাবে জানেন, তাঁকে আর দেহত্যাগ করার পর পুনরায় জন্মগ্রহণ করতে হয় না, তিনি আমার নিত্য ধাম লাভ করেন।
অনুবাদ: আসক্তি, ভয় ও ক্রোধ থেকে মুক্ত হয়ে, সম্পূর্ণরূপে আমাতে মগ্ন হয়ে, একান্তভাবে আমার আশ্রিত হয়ে, পূর্বে বহু বহু ব্যক্তি আমার জ্ঞান লাভ করে পবিত্র হয়েছে- এবং এভাবেই সকলেই আমার অপ্র্রাকৃত প্রীতি লাভ করেছে।
অনুবাদ: কোন কর্মই আমাকে প্রভাবিত করতে পারে না এবং আমিও কোন কর্মফলের আকাঙ্ক্ষা করি না। আমার এই তত্ত্ব যিনি জানেন, তিনিও কখনও সকাম কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ হন না।
অনুবাদ: প্রাচীনকালে সমস্ত মুক্ত পুরুষেরা আমার অপ্রাকৃত তত্ত্ব অবগত হয়ে কর্ম করেছেন। অতএব তুমিও সেই প্রাচীন মহাজনদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তোমার কর্তব্য সম্পাদন কর।
অনুবাদ: কাকে কর্ম ও কাকে অকর্ম বলে, তা স্থির করতে বিবেকী ব্যক্তিরাও মোহিত হন। আমি সেই কর্ম বিষয়ে তোমাকে উপদেশ করব। তুমি তা অবগত হয়ে সমস্ত অশুভ অবস্থা থেকে মুক্ত হবে।
অনুবাদ: যিনি কর্মে অকর্ম দর্শন করেন এবং অকর্মে কর্ম দর্শন করেন, তিনিই মানুষের মধ্যে বুদ্ধিমান। সব রকম কর্মে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত।
যস্য, সর্বে, সমারম্ভাঃ, কাম-সংকল্প-বর্জিতাঃ,
জ্ঞান-অগ্নি-দগ্ধ-কর্মাণাম্, তম্, আহুঃ, পণ্ডিতম্, বুধাঃ ।।১৯।। অনুবাদ ,যাঁর সমস্ত কর্ম প্রচেষ্টা কাম ও সংকল্প রহিত, তিনি পূর্ণ জ্ঞানে অধিষ্ঠিত। জ্ঞানীগণ বলেন যে, তাঁর সমস্ত কর্মের প্রতিক্রিয়া পরিশুদ্ধ জ্ঞানাগ্নি দ্বারা দগ্ধ হয়েছে।
অনুবাদ: যিনি কর্মফলের আসক্তি সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করে সর্বদা তৃপ্ত এবং কোন রকম আশ্রয়ের অপেক্ষা করেন না, তিনি সব রকম কর্মে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও কর্মফলের আশায় কোন কিছুই করেন না।
অনুবাদ: এই প্রকার জ্ঞানী ব্যক্তি তাঁর মন ও বুদ্ধিকে সর্বতোভাবে সংযত করে কার্য করেন। তিনি প্রভুত্ব করার প্রবৃত্তি পরিত্যাগ করে কেবল জীবন ধারণের জন্য কর্ম করেন। এভাবেই কর্ম করার ফলে কোন রকম পাপ তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না।
অনুবাদ: যিনি অনায়াসে যা লাভ করেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকেন, যিনি সুখ-দুঃখ রাগ-দ্বেষ আদি দ্বন্দ্বের বশীভূত হন না এবং মাৎসর্যশূন্য, যিনি কার্যের সাফল্য ও অসাফল্যে অবিচলিত থাকেন, তিনি কর্ম সম্পাদন করলেও কর্মফলের দ্বারা কখনও আবদ্ধ হন না।
অনুবাদ: জড়া প্রকৃতির গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে, চিন্ময় জ্ঞাননিষ্ঠ ব্যক্তি যজ্ঞের উদ্দেশ্যে যে কর্ম সম্পাদন করেন, সেই সকল কর্ম সম্পূর্ণরূপে লয় প্রাপ্ত হয়।
অনুবাদ: যিনি কৃষ্ণভাবনায় সম্পূর্ণ মগ্ন তিনি অবশ্যই চিৎজগতে উন্নীত হবেন, কারণ তাঁর সমস্ত কার্যকলাপ চিন্ময়। তাঁর কর্মের উদ্দেশ্য চিন্ময় এবং সেই উদ্দেশ্যে তিনি যা নিবেদন করেন, তাও চিন্ময়।
অনুবাদ: কেউ কেউ (শুদ্ধ ব্রহ্মচারীরা) মনঃসংযমরূপ অগ্নিতে শ্রবণ আদি ইন্দ্রিয়গুলিকে আহুতি দেন, আবার অন্য অনেকে ( নিয়মনিষ্ঠ গৃহস্থেরা) শব্দাদি ইন্দ্রিয়ের বিষয়গুলিকে ইন্দ্রিয়রূপ অগ্নিতে আহুতি দেন।
অনুবাদ: মন ও ইন্দ্রিয়-সংযমের মাধ্যমে যাঁরা আত্মজ্ঞান লাভের প্রয়াসী, তাঁরা তাঁদের সমস্ত ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপ ও প্রাণবায়ু জ্ঞানের দ্বারা প্রদীপ্ত আত্মাসংযমরূপ অগ্নিতে আহুতি দেন।
অনুবাদ: কঠোর ব্রত গ্রহণ করে কেউ কেউ দ্রব্য দানরূপ যজ্ঞ করেন। কেউ কেউ তপস্যারূপ যজ্ঞ করেন, কেউ কেউ অষ্টাঙ্গ-যোগরূপ যজ্ঞ করেন এবং অন্য অনেকে পারমার্থিক জ্ঞান লাভের জন্য বেদ অধ্যয়নরূপ যজ্ঞ করেন।
অনুবাদ: আর যাঁরা প্রাণায়াম চর্চায় আগ্রহী, তাঁরা অপান বায়ুকে প্রাণবায়ুতে এবং প্রাণবায়ুকে অপান বায়ুতে আহুতি দিয়ে অবশেষে প্রাাণ ও অপান বায়ুর গতি রোধ করে সমাধিস্থ হন। কেউ আবার আহার সংযম করে প্রাণবায়ুকে প্রাণবায়ুতেই আহুতি দেন।
অনুবাদ: এই সমস্ত যজ্ঞই বৈদিক শাস্ত্রে অনুমোদিত হয়েছে এবং এই সমস্ত যজ্ঞ বিভিন্ন প্রকার কর্মজাত। সেগুলিকে যথাযথভাবে জানার মাধ্যমে তুমি মুক্তি লাভ করতে পারবে।
অনুবাদ: সদ্ গুরুর শরণাগত হয়ে তত্ত্বজ্ঞান লাভ করার চেষ্টা কর। বিনম্র চিত্তে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা কর এবং অকৃত্রিম সেবার দ্বারা তাঁকে সন্তুষ্ট কর ৷ তা হলে সেই তত্ত্বদ্রষ্টা পুরুষেরা তোমাকে জ্ঞান উপদেশ দান করবেন।
অনুবাদ: হে পাণ্ডব ! এভাবে তত্ত্বজ্ঞান লাভ করে তুমি আর মোহগ্রস্ত হবে না, কেন না এই জ্ঞানের দ্বারা তুমি দর্শন করবে যে, সমস্ত জীবই আমার বিভিন্ন অংশ অর্থাৎ তারা সকলেই আমার এবং তারা আমাতে অবস্থিত ।
অনুবাদ: এই জগতে চিন্ময় জ্ঞানের মতো পবিত্র আর কিছুই নেই। এই জ্ঞান সমস্ত যোগের পরিপক্ক ফল৷ভগবদ্ভক্তি অনুশীলনের মাধ্যমে যিনি সেই জ্ঞান আয়ত্ত করেছেন, তিনি কালক্রমে আত্মায় পরা শান্তি লাভ করেন।
অনুবাদ: সংযতেন্দ্রিয় ও তৎপর হয়ে চিন্ময় তত্ত্বজ্ঞানে শ্রদ্ধাবান ব্যক্তি এই জ্ঞান লাভ করেন, সেই দিব্য জ্ঞান লাভ করে তিনি অচিরেই পরা শান্তি প্রাপ্ত হন।
অনুবাদ: অজ্ঞ ও শাস্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাহীন ব্যক্তি কখনই ভগবদ্ভক্তি লাভ করতে পারে না। সন্দিগ্ধ চিত্ত ব্যক্তি ইহলোকে সুখভোগ করতে পারে না এবং পরলোকেও সুখভোগ করতে পারে না।
অনুবাদ: অতএব, হে ধনঞ্জয় ! যিনি নিষ্কাম কর্মযোগের দ্বারা কর্মত্যাগ করেন, জ্ঞানের দ্বারা সংশয় নাশ করেন এবং আত্মার চিন্ময় স্বরূপ অবগত হন, তাঁকে কোন কর্মই আবদ্ধ করতে পারে না।
শ্লোক ৪২
তস্মাদজ্ঞানসম্ভূতং হৃৎস্থং জ্ঞানাসিনাত্মনঃ ।
ছিত্ত্বৈনং সংশয়ং যোগমাতিষ্ঠোত্তিষ্ঠ ভারত ।।৪২।।
অনুবাদ: অতএব, হে ভারত ! তোমার হৃদয়ে যে অজ্ঞানপ্রসূত সংশয়ের উদয় হয়েছে, তা জ্ঞানরূপ খড়গের দ্বারা ছিন্ন কর। যোগাশ্রয় করে যুদ্ধ করার জন্য উঠে দাঁড়াও।
ওঁ তৎসদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে 'জ্ঞানযোগো' নাম চতুর্থোঽধ্যায়ঃ ॥৪॥