লেখক- শ্রী স্বপন কুমার রায়
মহা ব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ ব্যাংক৷
সাধারণ সম্পাদক, শ্রী শ্রী গীতাসংঘ, মতিঝিল শাখা, ঢাকা৷
--------------------------------------
কর্ম ও সন্ন্যাসের সম্বন্ধ এবং কর্মফলাফল সম্পর্কিত আলোচনাই এই অধ্যায়ের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। আলোচনার বিষয়বস্তুর সংগে সামঞ্জস্য রেখেই এ অধ্যায়ের নামকরণ করা হয়েছে 'কর্ম-সন্ন্যাস যোগ'। অধ্যায়টি অর্জুনের জিজ্ঞাসা দিয়ে শুরু হয়েছে। এখানে অর্জুনের জিজ্ঞাসা-কর্ম ত্যাগ ও সন্ন্যাস গ্রহণ পূর্বক জ্ঞানযোগের অনুশীলন অথবা নিষ্কাম কর্মযোগের অনুশীলন, এর মধ্যে কোনটি তার জন্য শ্রেয়স্কর। অর্জুনের মনে এপ্রশ্নের উদ্রেক হওয়ার কারণ পূর্ববর্তী অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক জ্ঞানযোগের ভূয়সী প্রশংসা করা সত্ত্বেও অধ্যায়ের শেষ শ্লোকে তিনি অর্জুনকে নিষ্কাম কর্মযোগীর ন্যায় কর্মে লিপ্ত হবার জন্য উপদেশ দিয়েছেন। তাই অর্জুনের সংশয় যে তিনি কি কর্ম ত্যাগ করে সন্ন্যাসীর ন্যায় জ্ঞানের সাধনায় ব্রতী হবেন, নাকি নিষ্কামভাবে নাকি নিষ্কামভাবে স্বধর্ম পালনে ব্রতী হবেন। অর্জুনের মনের এই সংশয় দূরীকরণার্থে শ্রীকৃষ্ণ বললেন যে, সন্ন্যাস ও কর্ম যোগ উভয়ই মোক্ষপ্রদ তবে এ দু'টির মধ্যে কর্ম যোগই শ্রেষ্ঠ। তিনি ব্যাখ্যা করে বললেন যে, কেবল অজ্ঞ ব্যক্তিগণই সন্ন্যাস ও কর্মযোগকে পৃথক মনে করে থাকেন; পন্ডিতগণ এমনটি মনে করেন না। কারণ এ উভয় পথের যে কোন একটিতেনিষ্ঠাবান পুরুষ একই ফল, 'মোক্ষ’ লাভ করে থাকেন। জ্ঞান নিষ্ঠ সন্ন্যাসীগণ জ্ঞান যোগের সাধনায় যে স্থান লাভ করেন, কর্মযোগীগণও সেই একই স্থান লাভ করেন। প্রকৃতপক্ষে যিনি জ্ঞান যোগ ও কর্মযোগের ফল একইরূপে দেখেন, তিনিই যথার্থদর্শী। অতপর তিনি বললেন যে, কর্মযোগ ব্যতীত সন্ন্যাস কেবল দুঃখের কারণ। কিন্ত্ত কর্মযোগযুক্ত সাধক অচিরেই ব্রহ্মপদ লাভ করেন। যিনি কর্মযোগযুক্ত, বিশুদ্ধচিত্ত, জিতেন্দ্রিয় এবং সর্বভূতের আত্মাই যার আত্মস্বরূপ, এরূপ পুরুষ কর্ম করেও কর্মে আবদ্ধ হয় না। ফলাসক্তি ও কর্তৃত্বাভিমান পরিত্যাগী কর্মযোগী কর্ম করেও জলে পদ্মপাতার ন্যায় পাপে লিপ্ত হয় না। এভাবে শ্রীকৃষ্ণ নিষ্কাম কর্মযোগের প্রসস্তি প্রতিপাদন করে অর্জুনের সংশয় ঘুচালেন। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।
অনুবাদ: অর্জুন বললেন- হে শ্রীকৃষ্ণ ! প্রথম তুমি আমাকে কর্ম ত্যাগ করতে বললে এবং তারপর কর্মযোগের অনুষ্ঠান করতে বললে। এই দুটির মধ্যে কোন্ টি অধিক কল্যাণকর, তা সুনিশ্চিতভাবে আমাকে বল।
অনুবাদ: হে মহাবাহো ! যিনি তাঁর কর্মফলের প্রতি দ্বেষ বা আকাঙ্ক্ষা করেন না, তাঁকেই নিত্য সন্ন্যাসী বলে জানবে ৷ এই প্রকার ব্যক্তি দ্বন্দ্বরহিত এবং পরম সুখে কর্মবন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করেন।
অনুবাদ: অল্পজ্ঞ ব্যক্তিরাই কেবল সাংখ্যযোগ ও কর্মযোগকে পৃথক পৃথক পদ্ধতি বলে প্রকাশ করে, পণ্ডিতেরা তা বলেন না। উভয়ের মধ্যে যে-কোন একটিকে সুষ্ঠুরূপে আচরণ করলে উভয়ের ফলই লাভ হয়।
অনুবাদ: যিনি জানেন, সাংখ্য-যোগের দ্বারা যে গতি লাভ হয়, কর্মযোগের দ্বারাও সেই গতি প্রাপ্ত হওয়া যায় এবং তাই যিনি সাংখ্যযোগ ও কর্ম-যোগকে এক বলে জানেন, তিনিই যথার্থ তত্ত্বদ্রষ্টা।
অনুবাদ: চিন্ময় চেতনায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তি দর্শন, শ্রবণ, স্পর্শ, ঘ্রাণ, ভোজন, গমন, নিদ্রা ও নিঃশ্বাস, আদি ক্রিয়া করেও সর্বদা জানেন যে, প্রকৃতপক্ষে তিনি কিছুই করছেন না। কারণ প্রলাপ, ত্যাগ, গ্রহণ, চক্ষুর উন্মেষ ও নিমেষ করার সময় তিনি সব সময় জানেন যে, জড় ইন্দ্রিয়গুলিই কেবল ইন্দ্রিয়ের বিষয়ে প্রবৃত্ত হয়েছে, তিনি নিজে কিছুই করছেন না।
অনুবাদ: যিনি সমস্ত কর্মের ফল পরমেশ্বর ভগবানকে অর্পণ করে অনাসক্ত হয়ে কর্ম করেন, কোন পাপ তাঁকে কখনও স্পর্শ করতে পারে না, ঠিক যেমন জল পদ্মপাতাকে স্পর্শ করতে পারে না।
অনুবাদ: বাহ্যে সমস্ত কার্য করেও মনের দ্বারা সমস্ত কর্ম ত্যাগ করে জীব নবদ্বার-বিশিষ্ট দেহরূপ গৃহে পরম সুখে বাস করতে থাকেন; তিনি নিজে কিছুই করেন না এবং কাউকে দিয়েও কিছু করান না।
অনুবাদ: দেহরূপ নগরীর প্রভু জীব কর্ম সৃষ্টি করে না, সে কাউকে দিয়ে কিছু করায় না এবং সে কর্মের ফলও সৃষ্টি করে না ৷ এই সবই হয় জড়া প্রকৃতির গুণের প্রভাবে।
অনুবাদ: জ্ঞানের প্রভাবে যাঁদের অজ্ঞান বিনষ্ট হয়েছে, তাঁদের সেই জ্ঞান অপ্রাকৃত পরমতত্ত্বকে প্রকাশ করে, ঠিক যেমন দিনমানে সূর্যের উদয়ে সব কিছু প্রকাশিত হয়।
অনুবাদ: যাঁর বুদ্ধি ভগবানের প্রতি উন্মুখ হয়েছে, মন ভগবানের চিন্তায় একাগ্র হয়েছে, নিষ্ঠা ভগবানে দৃঢ় হয়েছে এবং যিনি ভগবানকে তাঁর একমাত্র আশ্রয় বলে গ্রহণ করেছেন, জ্ঞানের দ্বারা তাঁর সমস্ত কলুষ সম্পূর্ণরূপে বিধৌত হয়েছে এবং তিনি জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্ত হয়েছেন।
অনুবাদ: যাঁদের মন সাম্যে অবস্থিত হয়েছে, তাঁরা ইহলোকেই জন্ম ও মৃত্যুর সংসার জয় করেছেন। তাঁরা ব্রহ্মের মতো নির্দোষ। তাই তাঁরা ব্রহ্মেই অবস্থিত হয়ে আছেন।
অনুবাদ: যে ব্যক্তি প্রিয় বস্তুর প্রাপ্তিতে উৎফুল্ল হন না এবং অপ্রিয় বস্তুর প্রাপ্তিতে বিচলিত হন না, যিনি স্থিরবুদ্ধি, মোহশূন্য ও ভগবৎ-তত্ত্ববেত্তা, তিনি ব্রহ্মেই অবস্থিত ।
অনুবাদ: সেই প্রকার ব্রহ্মবিৎ পুরুষ কোন রকম জড় ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের প্রতি আকৃষ্ট হন না, তিনি চিদ্গত সুখ লাভ করেন। ব্রহ্মে যোগযুক্ত হয়ে তিনি অক্ষয় সুখ ভোগ করেন।
অনুবাদ: বিবেকবান পুরুষ দুঃখের কারণ যে ইন্দ্রিয়জাত বিষয়ভোগ তাতে আসক্ত হন না। হে কৌন্তেয় ! এই ধরনের সুখভোগ আদি ও অন্তবিশিষ্ট৷ তাই, জ্ঞানী ব্যক্তিরা তাতে প্রীতি লাভ করেন না।
অনুবাদ: মন থেকে বাহ্যইন্দ্রিয়ের বিষয় প্রত্যাহার করে, ভ্রূযুগলের মধ্যে দৃষ্টি স্থির করে, নাসিকার মধ্যে বিচরণশীল প্রাণ ও অপান বায়ুর উর্ধ্ব ও অধোগতি রোধ করে, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি সংযম করে এবং ইচ্ছা, ভয় ও ক্রোধ শূন্য হয়ে যে মুনি সর্বদা বিরাজ করেন, তিনি নিশ্চিতভাবে মুক্ত।
শ্লোক ২৮
যতেন্দ্রিয়মনোবুদ্ধির্মুনির্মোক্ষপরায়ণঃ ।
বিগতেচ্ছাভয়ক্রোধো যঃ সদা মুক্ত এব সঃ ॥২৮॥
অনুবাদ: আমাকে সমস্ত যজ্ঞ ও তপস্যার পরম ভোক্তা, সর্বলোকের মহেশ্বর এবং সমস্ত জীবের সুহৃদরূপে জেনে যোগীরা জড় জগতের দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্ত হয়ে শান্তি লাভ করেন।
ওঁ তৎসদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে 'কর্মসন্ন্যাসযোগো' নাম পঞ্চমোঽধ্যায়ঃ ॥৫॥